দোস্ত তুই আসলেই একটা টিউবলাইট!

1499

উপরের কথাটা প্রায়ই আমরা কোন না কোন বন্ধুকে ব্যাঙ্গার্থে বলে থাকি,বিশেষ করে সে যদি কোন কিছু বুঝতে দেরি করে। কারণ আমাদের সবার জানা,টিউব লাইট আসলেই খুব দেরিতে জ্বলে। ফিলামেন্ট বাল্বের হলুদ আলো এখন দেশ থেকে প্রায় উধাও হয়ে গিয়েছে বললেই চলে। দিনের আলো ফুরাতে না ফুরাতেই পথে-ঘাটে দোকানপাট,বাসা-বাড়ি যে টিউবলাইটের শুভ্র আলোতে ঝলমল করে উঠে,সেই টিউবলাইট মহাশয় আমাদের ওই সরল প্রকৃতির বন্ধুর মত কিভাবে ধীরগতিতে জ্বলে উঠেন তা কি আমরা জানি? জানলেও পুরনো জ্ঞানকে খানিকটা ঝালাই করে নেই।

টিউবলাইটের প্রধান অংশ হল একটি ফাঁপা কাচের টিউব,যার ভিতরে থাকে পারদ-বাষ্প এবং কিছু নিষ্ক্রিয় গ্যাস (সাধারণত খুব কম চাপে রাখা আর্গন গ্যাস)। টিউবের ভিতরের দিকের কাচের গায়ে ফসফরাসের প্রলেপ দেওয়া থাকে। টিউবের প্রত্যেকপ্রান্তে থাকে দুটি করে তড়িৎ-দন্ড(ইলেক্ট্রোড),যা একটি বৈদ্যুতিক সার্কিটের সাথে যুক্ত থাকে। ইলেক্ট্রোডগুলো এ.সি. তড়িৎ উৎসের সাথে যুক্ত থাকে।

 

যখন টিউবলাইটটি অন করা হয়,টিউবলাইটের দুইপ্রান্তের সার্কিটের ফিলামেন্ট দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। ফলশ্রুতিতে টিউবের দুইপ্রান্তে যথেষ্ট ভোল্টেজ জমা হয়,যার কারণে ইলেক্ট্রন ফিলামেন্ট থেকে গ্যাসে পরিবাহিত হয়ে টিউবের এক প্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে যেতে পারে। এই সকল চার্জ কিছু তরল পারদ কে বাষ্পে পরিণত করে। ইলেক্ট্রন এবং চার্জিত গ্যাসের প্রবাহ যখন টিউবের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলতে থাকে, তখন তারা বাষ্পীয় পারদের সাথে সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়। এই সংঘর্ষ অণুগুলোর অভ্যন্তরের ইলেক্ট্রনগুলো উত্তেজিত হয়ে নিজ কক্ষপথ ছেড়ে উপরের কক্ষপথে চলে যায়। পরবর্তিতে ইলেক্ট্রনগুলো যখন পূর্বের কক্ষপথে ফেরত আসে তখন তারা এই শক্তি আলোক ফোটন হিসাবে ত্যাগ করে। এই ফোটনগুলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য অণুর নির্দিষ্ট ইলেক্ট্রন বিন্যাসের উপর নির্ভর করে,পারদের ইলেক্ট্রন গুলো এভাবে বিন্যস্ত থাকে যে ত্যাগকৃত ফোটনের বেশিরভাগই অতিবেগুনি আলোকরশ্মির তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের হয়। আমাদের চোখ এই ধরণের আলোক রশ্মি দেখতে পাররে না তাই একে দৃশ্যমান আলোতে পরিণত করতে হয়। টিউবলাইটের ফসফরাসের প্রলেপ এই কাজটি করে থাকে। ফসফরাসের প্রলেপে পারদ-নিষ্ক্রিত ফোটন আঘাত করলে ফসফরাস অণুর ইলেক্ট্রন গুলো উত্তেজিত হয়ে নিজ কক্ষপথ ছেড়ে উপরস্থ কক্ষপথে চলে যায়,যখন তারা স্থিতিশীল হয়ে পূর্বের কক্ষপথে ফেরত আসে তখন তারা কিছু শক্তি আলোকরশ্মি হিসাবে ত্যাগ করে,যার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য পারদ-নিষ্ক্রিত ফোটনের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য থেকে কম কারণ কিছু শক্তি তাপ হিসাবে নিষ্ক্রিত হয়। সাধারণত এই আলোর রঙ হয় সাদা,তবে উৎপাদনের সময় ভিন্ন ফসফরাসের বিন্যাস ব্যবহার করে অন্য যেকোন রঙের আলো তৈরি সম্ভব।

এইতো গেল টিউবলাইটের আলোর রহস্য,এখন আসা যাক এই আলো কিভাবে তৈরি হয় সেই রহস্য উদঘাটনে। আমরা জানি ,ইলেক্ট্রন সবসময় নেগেটিভ চার্জিত প্রান্ত থেকে পজিটিভ চার্জিত প্রান্তে প্রবাহিত হয়,তাই যখন ই লাইটটি আমরা জ্বালাবো প্রথম যে জিনিসটি আমাদের দরকার হবে তা হল প্রচুর মুক্ত ইলেকট্রন। সাধারণত আমরা যে টিউবলাইট দেখে থাকি তাতে বিশেষ একধরণের স্টার্টার সুইচ ব্যবহার করা হয়,যার connections নিচের ছবিতে দেখান হল।

 

যখন টিউবলাইটটি জ্বালানো হয় তখন বিদ্যুৎ ইলেক্ট্রোড হয়ে ফিলামেন্টগুলোকে উত্তপ্ত করে,যার ফলে ইলেক্ট্রন মুক্ত হয়ে গ্যাসকে আয়োনিত করে। ঠিক এই সময়েই স্টার্টার এর ভিতরেও একধরণের বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়। স্টার্টার সুইচ একধরনের ফাপা বাল্ব যার ভিতরে নিয়ন বা অন্য কোন গ্যাস থাকে। এর উপরে দুই প্রান্তে দুটি ইলেক্ট্রোড থাকে। এই ইলেক্ট্রোড গুলোর একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়ে ইলেক্ট্রন প্রবাহিত হবার চেষ্টা করে। ইলেক্ট্রোডগুলোর একটি বিশেষধরণের সংকর ধাতুর তৈরি হয় যা অতিরিক্ত তাপে বাঁকা হয়ে অপর ইলক্ট্রোডকে স্পর্শ করে,যার ফলে বিদ্যুৎ টিউবের ফিলামেন্টের ভিতর দিয়ে না গিয়ে স্টার্টার এর কম রোধযুক্ত সর্ট সার্কিট দিয়ে চলে যায়। আবার ঠান্ডা হয়ে গেলে ইলেক্ট্রোড পূর্বের জায়গায় চলে যায়।

 

এখন টিউবের ভিতর পর্যাপ্ত মুক্ত ইলেকট্রন আছে,যা টিউবের ভিতর একধরনের তড়িৎ পরিবাহী মাধ্যম তৈরি করে। টিউবলাইটের ফিলামেন্টের মধ্য দিয়ে যখন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় তখন তা ব্যালাস্টের মধ্যে চুম্বকক্ষেত্র তৈরি করে,যা ফিলামেন্টের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রবাহের মাধ্যমে টিকে থাকে। যখন স্টার্টারের বর্তনি পূর্ণ হয়ে ফিলামেন্টে বিদ্যুৎ প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় তখন ব্যালাস্টের চুম্বকক্ষেত্রে বাধা পরে,যার ফলে তড়িতপ্রবাহ হঠাৎ বেড়ে যায়। এই তড়িত প্রবাহ পূর্বে বর্ণিত উপায়ে পারদবাষ্পকে আঘাত করে এবং পরবর্তিতে যা ফসফরাসের মাধ্যমে আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত করে। যখন স্টার্টার সুইচ নষ্ট হয়ে যায় তখন টিউবের ভেতরের গ্যাস কখনই সঠিকভাবে পরিবাহী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে না যার ফলে টিউবলাইট জ্বলতে এবং নিভতে থাকে।

এই বিশাল নোটটি পড়ে আমরা যাই শিখি না কেন,এটা মোটামুটি স্পষ্ট,সহজে কোন বন্ধুকে বলা যাবে না, "দোস্ত তুই আসলেই একটা টিউব-লাইট” :p

 

লিখাটি নিয়ে আপনার অভিমত কি?