ডিজিটাল ক্যামেরাঃ বেশি পিক্সেল মানেই কি ভালো ছবি?

67

ডিজিটাল ক্যামেরাঃ

সময়ের সাথে সাথে আমরা ক্রমেই এনালগ যুগ থেকে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছি। এবং এই যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তন এসেছে আমাদের জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে আমাদের নিত্য ব্যবহৃত জিনিসপত্রেও।

আজ কথা বলব ডিজিটাল ক্যামেরা এবং এর পিক্সেল নিয়ে। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে ডিজিটাল যুগের সাথে তাল মিলাতে বাজারে এখন ক্যামেরা বলতে আমরা বুঝি ডিজিটাল ক্যামেরা। এনালগ ক্যামেরায় আমরা ব্যবহার করতাম ফিল্মস। কিন্তু ডিজিটাল ক্যামেরা তে ফিল্ম ছাড়াই ছবি তোলা যায় দেখে একে ফিল্মলেস ক্যামেরাও বলে।

ডিজিটাল ক্যামেরা
ডিজিটাল ক্যামেরা

ডিজিটাল ক্যামেরা'য় ব্যবহার করা হয় অপটিকাল সেন্সর। এই সেন্সর এর কাজ হচ্ছে আমরা যে বস্তুর ছবি তুলব সেই বস্তু থেকে আসা আলোকে ইলেকট্রিক চার্জে পরিণত করা।

বেশিরভাগ ডিজিটাল ক্যামেরা তে ইমেজ সেন্সর হিসেবে  CCD(Charge Couple Device)  ব্যবহার করা হয়। আবার কিছু কিছু ক্যামেরায় ইমেজ সেন্সর হিসেবে CMOS (Complementary Metal Oxide Semiconductor) টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়। CCD এবং CMOS এর ইমেজ সেন্সর পদ্বতি সম্পূর্ন ভিন্ন ।

CCD সেন্সর এ সবগুলো পিক্সেল এর জন্য একটি মাত্র এমপ্লিফায়ার বা বিবর্ধক থাকে। যেখানে CMOS  সেন্সরে প্রতিটি আলাদা আলাদা পিক্সেল এর জন্য আলাদা আলাদা এমপ্লিফায়ার থাকে। আবার CCD সেন্সর এর তুলনায় CMOS  সেন্সর পাওয়ার ও কম ব্যবহার করে। তবে ছবি কেমন আসবে এটা যতটা না সেন্সর এর প্রকারভেদের উপর নির্ভর করে তার চেয়ে বেশি নির্ভর করে ইমেজ প্রসেসিং এর এলগরিদম এবং ক্ষমতার উপর।

পিক্সেলঃ

পিক্সেল কথাটি আমরা প্রায় শুনি বিশেষ করে যারা নতুন ফোন কিংবা ডিজিটাল ক্যামেরা কিনি। যেমন, অমুক ফোনের ক্যামেরা ৮ মেগাপিক্সেল, তমুক ফোনের ক্যামেরা ১৪ মেগাপিক্সেল। এই মেগাপিক্সেল বা পিক্সেল আসলে কি?

পিক্সেল বলতে বোঝায় একটা ছবির এক বিন্দু তথ্য। এবং কোনো সেন্সর এর পিক্সেল কাউন্ট বলতে বোঝায় সেই সেন্সরে পিক্সেল এর মোট সংখ্যা। পিক্সেল কাউন্ট হল একটি ছবির সারি(Row) এবং কলাম(Column) এ যত পিক্সেল আছে তার গুণফল। যেমন, একটি সেন্সর যদি ১০০০*১০০০ পিক্সেল এর হয় তাহলে এর পিক্সেল কাউন্ট হবে ১০০০০০০ বা ১ মেগাপিক্সেল। এভাবেই পিক্সেল কাউন্টের উপর ভিত্তি করে ক্যামেরার পিক্সেল এর সংখ্যা বেড়ে সেই ক্যামেরা ৮ কিংবা ১৪ কিংবা অন্য কোনো সংখ্যার মেগাপিক্সেল হয়।

পিক্সেল বেশি হলেই ছবি ভালো হয় কিনা!

একটা ধারণা আমাদের মধ্যে আছে যে পিক্সেল যত বেশি হবে ছবির কোয়ালিটি বা মান তত ভালো হবে। কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। অবশ্য বিক্রেতা কেনার সময় বলতে পারে যে, মেগাপিক্সেল যত বেশি হবে ছবি তত ভালো আসবে। কারণ ক্যামেরার মেগাপিক্সেল এর মান যত বেশি হবে দামটাও একটু বেশি হবে। হাহা।

আমরা ইতিমধ্যে জেনেছে, পিক্সেল বলতে বোঝায় একটা ছবির এক বিন্দু তথ্য। এরকম একটি ডিজিটাল ছবিতে মিলিয়ন মিলিয়ন তথ্য বিন্দু বা পিক্সেল থাকে। এবং ১ মেগা=১ মিলিয়ন।

সুতরাং ৮ মেগা মানে ৮ মিলিয়ন। কিংবা ২০ মেগাপিক্সেল মানে ২০ মিলিয়ন পিক্সেল। যেহেতু ডিজিটাল ক্যামেরার ছবিগুলোর আকার আয়তাকার আকৃতির হয়ে থাকে, সেহেতু এর দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থের অনুপাত সমান হয়না।

এখন আমরা যদি একটা ল্যান্ডস্কেপ ছবির কথা চিন্তা করি তাহলে ধরা যাক, ১০ মেগাপিক্সেল এবং ১৮ মেগাপিক্সেল এর ২ টা ক্যামেরার ক্ষেত্রে কি হবে?

১০ মেগাপিক্সেল এর ক্যামেরার ছবির পিক্সেল এর অনুপাত হবে,

৩৮৭২*২৫৯২ [প্রস্থ=৩৮৭২, দৈর্ঘ্য=২৫৯২ ]

১৮ মেগাপিক্সেল এর ক্যামেরার ছবির পিক্সেল এর অনুপাত হবে,

৫১৮৪*৩৪৫৬ [প্রস্থ=৫১৮৪, দৈর্ঘ্য=৩৪৫৬ ]

উক্ত পিক্সেল এর সংখ্যা কে গুণ করলে আমরা মোট পিক্সেল এর সংখ্যা পাবো। যেমন,

৩৮৭২*২৫৯২=১০০,৩৬,২২৪=১০ মিলিয়ন পিক্সেল বা ১০ মেগাপিক্সেল।

৫১৮৪*৩৪৫৬=১৭৯,১৫,৯০৪=১৮ মিলিয়ন পিক্সেল বা ১৮ মেগাপিক্সেল।

এখন খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে, ১০ মেগাপিক্সেল এর ক্যামেরা থেকে ১৮ মেগাপিক্সেল এর ক্যামেরার কোয়ালিটি ভালো হবে। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। এখানে কিছুটা ফাঁকফোকর আছে।

১৮ মেগাপিক্সেল এর ক্যামেরায় তোলা ছবিটা আকারে ১০ মেগাপিক্সেল এর ছবির চেয়ে বড় হবে এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কেউ যদি আকারে ছোট সাইজের ছবি প্রিন্ট করে যেমন ৪*৬ সাইজের, তাহলে কোন ছবিটা ১০ মেগাপিক্সেল এর ক্যামেরায় তোলা, আর কোন ছবিটা ১৮ মেগাপিক্সেল এর ক্যামেরায় তোলা সেটা বের করা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার হবে। প্রকৃতপক্ষে ৯*১২ সাইজের ছবি পর্যন্ত এই দুই মেগাপিক্সেল এর ক্যামেরায় তেমন কোনো পার্থক্য ধরা যাবেনা। যেমন, নিচের ছবিটি থেকে কি কেউ বুঝতে পারবেন কোন ছবিটি কত পিক্সেলের ক্যামেরায় তোলা? উত্তরটি আছে কোথাও। পুরোটা পড়লে পেয়ে যাবেন উত্তর। ধাঁধাঁ রইল 🙂

ছোট সাইজের ছবির তুলনা
ছোট সাইজের ছবির তুলনা

তবে কেউ যদি ১৬*২০ সাইজের ছবি প্রিন্ট করে তবে অবশ্যই ১৮ মেগাপিক্সেল এর ক্যামেরার ছবির কোয়ালিটি ভালো হবে। আর দ্বিতীয় কথা হল, শুধু প্রিন্টের সাইজ ই নয়। পিক্সেল যত বেশি হবে সেই ছবির ডিজিটাল ফাইল এর আকার ও বেশি হবে। এজন্য কেউ যদি বেশি মেগাপিক্সেল এর ক্যামেরায় ছবি তোলে সেই ছবি সংরক্ষণের জন্য মেমোরি কার্ডের ধারণ ক্ষমতাও বেশি হতে হবে।

এক কথায় বড় সাইজের ছবি মানে---

  •  মেমোরি কার্ডের ক্যাপাসিটি বেশি হতে হবে
  • মেমোরি কার্ড থেকে কম্পিউটার এ স্থানান্তর এ বেশি সময় নেবে।
  • কম্পিউটার এর হার্ড ড্রাইভ এ অতিরিক্ত জায়গা দখল করবে।
  • ই-মেইল কিংবা কোনো সোশ্যাল সাইটে আপলোড কিংবা পাঠানোর ক্ষেত্রে এর সাইজ কমিয়ে নিতে হবে কিংবা অটোমেটিক কমে যাবে।
  • কোনো অনলাইন গ্যালারি তে ছবি সংরক্ষণ করতে চাইলে আপলোডে অনেক সময় নিবে।

নিচের টেবিল থেকে সহজেই একটা ধারণা পাওয়া যাবে যে কত মেগাপিক্সেল এর ক্যামেরায় সর্বোচ্চ কত সাইজ পর্যন্ত ছবির কোয়ালিটি ভালো থাকবে।

মেগাপিক্সেল সংখ্যা ছবির ডাইমেনশান গ্রহণযোগ্য প্রিন্ট সাইজ(ইঞ্চিতে)
2.0 1740 x 1160 4 x 6 [standard]
3.0 2160 x 1440 5 x 7
4.0 2450 x 1633 8 x 10
6.0 3000 x 2000 9 x 12
8.0 3504 x 2336 9 x 12
10.0 3872 x 2592 10 x 15
12.0 4256 x 2832 11 x 17
14.0 4608 x 3072 12 x 18
16.0 4928 x 3264 16 x 20
18.0 5184 x 3456 16 x 20
24.0 6016 x 4000 20 x 24

এখন প্রশ্ন করা যায়, এত সময় এবং জায়গা খরচ করলে কেনই বা কিনব বেশি মেগাপিক্সেল এর ডিজিটাল ক্যামেরা!

সবচেয়ে বড় সুবিধা আপনি বড় আকারের ছবি প্রিন্ট করতে পারবেন ছবির কোয়ালিটি নষ্ট হওয়া ছাড়াই। যেমন, ১২ মেগাপিক্সেল এর একটা ছবি এবং ২০ মেগাপিক্সেল এর একটা ছবি ৪*৬ সাইজে প্রিন্ট করলে কোনো পার্থক্যই ধরা যাবেনা। কিন্তু একই ছবি যদি ২০*২৪ সাইজে প্রিন্ট করা হয় তাহলে কোয়ালিটিতে ব্যাপক পার্থক্য ধরা যাবে। ১২ মেগাপিক্সেল এর ছবিটার শার্পনেস এবং কালার কোয়ালিটি অনেকটাই কমে যাবে। অনেকটা নিচের ছবিটির মত।

পিক্সেল কাউন্ট কারণে পার্থক্য
পিক্সেল কাউন্ট কারণে পার্থক্য

আরেকটা সুবিধা হল আপনি যদি ছবি এডিটিং এ পারদর্শী হন কিংবা পছন্দ করেন তাহলে বেশি মেগাপিক্সেল এর ক্যামেরা আপনার জন্য। ধরুন আপনি একটি ছবি তুললেন  নিচের মত করে। কিন্তু আপনার উদ্দেশ্য ছিল পাখিটার আরো ক্লোজ শট নেয়া। এক্ষেত্রে আপনার ক্যামেরার মেগাপিক্সেল বেশি হলে আপনার সমস্যা সমাধান অনেকটাই সহজ।

ফুল সাইজ

ধরুন, আপনার ক্যামেরা ১৮ পিক্সেল। যা দিয়ে আপনি খুব সহজেই ভালো কোয়ালিটির ১৬*২০ সাইজের ছবি পাবেন। কিন্তু যেহেতু আপনি পাখিটার ক্লোজ শট নিতে চেয়েছিলেন তাহলে আপনি এখন চাইলে উপরের ছবিটি থেকে সুবিধামত অংশ কেটে(crop) নিতে পারেন।

কেটে নেয়ার পরের অবস্থা
কেটে নেয়ার পরের অবস্থা

ছবিটি কেটে নেয়ার ফলে আপনার পিক্সেল সংখ্যার অনেকটুকুই কমে যাবে। ধরুন, আপনি ১২ মেগাপিক্সেল ই কেটে ফেললেন। ৬ মেগাপিক্সেল এর মত রাখলেন। যেন শুধু পাখিটিই ফোকাস হয়। এরপরও আপনি ৯*১২ সাইজের ছবি পাবেন কোনো কোয়ালিটি লস ছাড়া। এটাতো ১৮ মেগাপিক্সেল এর কথা বললাম। এখন কারো ক্যামেরা যদি হয় ২৪ মেগাপিক্সেল বা আরো বেশি সেক্ষেত্রে এই কাজগুলো হবে আরো সহজ এবং ফোকাসিং শট এর ইমেজ ও পাওয়া যাবে আরো বড় আকারে।

সুতরাং কারো যদি বড় আকারের ছবির প্রতি দুর্বলতা থাকে তাহলে তার জন্য বেশি মেগাপিক্সেল এর ক্যামেরা ঠিক আছে। কিন্তু কেউ যদি কাজের প্রয়োজনে কাউকে মেইলে পাঠানো কিংবা ছোট সাইজের ছবি প্রিন্ট করতে চায় তাহলে তার জন্য বেশি মেগাপিক্সেল এর ডিজিটাল ক্যামেরা মানে টাকা, সময়, স্পেস সবকিছুরই অপচয়।

তবে এছাড়াও আরো অনেক খুঁটিনাটি ব্যাপার আছে ডিজিটাল ক্যামেরা তে ভালো ছবি পাওয়ার জন্য। পরে অন্য কোনো দিন ফিরে আসব অন্য কোনো খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে।

ও হ্যাঁ ধাঁধাঁর উত্তর তো বলা হয়নি।

যারা বুঝেছেন তাদের অভিনন্দন। আর যারা বুঝেন নি তাদের জন্য,

প্রথম ছবিটি ১২ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরায় তোলা, আর দ্বিতীয়টি ১৬ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরায় তোলা 🙂

রেফারেন্সঃ

  1. http://digicamhelp.com/camera-features/camera-parts/megapixels/
  2. http://www.digital-slr-guide.com/define-megapixels.html
  3. https://www.cambridgeincolour.com/tutorials/digital-camera-pixel.htm

 

লিখাটি নিয়ে আপনার অভিমত কি?