এলন মাস্ক: প্রযুক্তির বরপুত্র!

174

পৃথিবী এখন আর আগের সেই পৃথিবীতে নেই। প্রতি মুহুর্তে পৃথিবী ছাড়িয়ে যাচ্ছে নিজেকে। ১ মিনিট আগের পৃথিবী আর ১ মিনিট পরের পৃথিবীর মধ্যে বিস্তর ফারাক। আমাদের বাসগৃহ এই পৃথিবীতে চলছে আবিষ্কার ও কর্মচাঞ্চল্যের এক মহোৎসব। ছেলে বড় হবে, চাকরি করে টাকা কামাবে এই প্রথাগত ধারণা এখন বদলেছে। প্রথাগত ধারণার বাইরে এসে জাকারবার্গ, স্টিভ জবস, সের্গেই ব্রিন এবং এলেন মাস্ক সহ অনেকের মতো

বিজ্ঞানের মানুষজন তাঁদের চমক লাগানো সব আইডিয়া দিয়ে পৃথিবীর পুরো স্ট্রাকচারই পরিবর্তন করে দিচ্ছে।
এলন মাস্ক সেই ধারারই একজন বিশেষভাবে গণ্য লোক। পৃথিবীর ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা শক্তিশালী দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের হাতে থাকলেও নতুন দিনের এই পার্শ্বনায়কেরাই হয়ে উঠছেন আগামী পৃথিবীর প্রচ্ছদচিত্র। তাদের হাত ধরেই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা পাচ্ছে নতুন মাত্রা। জীবন ধারণে, জীবন যাপনে আসছে বর্ণিল বৈচিত্র্যের ছোঁয়া।

তো যে কথা বলছিলাম, এলন মাস্ক। যারা জানেন তারা তো জানেনই। আর যারা এই নামটিই শুনেননি, তাদের জন্যই আজকের আয়োজন!

আপনারা অনেকেই ফ্রিল্যান্সিং কিংবা আউটসোসিং এর নাম শুনে থাকবেন। বিশেষ করে যারা ইন্টারনেটে নিয়মিত আউটসোর্সিং এর কাজ করেন, তাদের জন্য টাকা আদান প্রদানের এক অপরিহার্য মাধ্যম হল পেপ্যাল। হ্যাঁ, এই পেপালের প্রতিষ্ঠাতাই এলন মাস্ক। যদিও তখন প্রতিষ্ঠানটির নাম তখন পেপ্যাল ছিলো না। আমরা পরবর্তীতে সেসব নিয়ে আলোচনা করবো। আচ্ছা, অনেকেই নিশ্চইয় টেসলা মটরস এর নাম শুনে থাকবেন। বেশ কিছুদিন এটা বেশ ভালো মানের হট কেক ছিলো। এছাড়া মঙ্গলে বসবাসের জন্য যে মহাকাশ প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে, সেই প্রতিষ্ঠানটির সিইও হচ্ছেন এই এলন মাস্ক, এই সভ্যতার সত্যিকারের আয়রন ম্যান। আজকে আমরা সাধারণ এলন মাস্ক থেকে আয়রন ম্যান এলন মাস্ক হয়ে উঠার গল্প বলবো। গল্পের মাঝখানে রূপকথার গল্পের ফ্লেভার মনে হলেও এটাই সত্যি এবং শুধুমাত্র এটা সম্ভব হয়েছে এলন মাস্কের কারনেই। ইয়েস, এলন মাস্ক! পৃথিবী পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। বাস্তবে তা করতে পারেন কয়জন?

তবে ব্যতিক্রমী এলন মাস্ক। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তিনি পাল্টে দিয়েছেন পৃথিবীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। মহাকাশযান, ইলেকট্রিক গাড়ি ও অনলাইন ট্রানসেকশন—এই তিন ইন্ডাস্ট্রিকে আমূল বদলে দেওয়া স্বপ্নবাজ মানুষটির সবচেয়ে বড় স্বপ্ন একদিন মঙ্গলে হবে তাঁর বসতি। মঙ্গলে কোনো এক ঘরে এক কাপ কফি খেতে খেতে মৃত্যু হবে তাঁর। এমনই পাগলাটে তিনি।

আমাদের এই  এলন মাস্ক একজন চমৎকার সফল উদ্যোক্তা এবং গবেষক। অসংখ্য ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বড় হওয়া মাস্ক যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন। পে-প্যাল, টেসলা মটরস সহ স্পেস এক্সপ্লোরেশন টেকনোলজি(SpaceX), জিপ২(zip2) এবং সোলার সিটির(SolarCity) সহপ্রতিষ্ঠাতা। একই সাথে ওপেন এ.আই(OpenAI) এর কো-চেয়ারম্যান

পুরো নাম এলন রীভ মাস্ক। জন্মেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায়, ১৯৭১ সালের ২৮ জুন। দক্ষিণ আফ্রিকান পিতা এবং কানাডিয়ান মায়ের ছেলে এলন মাস্কের ছেলেবেলা কাটে তার ভাই কিম্বাল এবং বোন টস্কার সাথে। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং মা ছিলেন মডেল। নয় বছর বয়সে যখন প্রথম কম্পিউটার হাতে পান, সেটির মেমরি ছিল ৫ কিলোবাইট । “How to Program” গাইড মাত্র তিনদিনে আত্মস্থ করে ছোট্ট মাস্ক একটা ভিডিও গেম বানিয়ে ফেললেন  ‘ব্লাস্ট’ নামে, যেটা তার মতে- ফ্ল্যাপি বার্ডের চেয়ে বহুগুণে ভাল। ১৯৮৩ সালে গেমটি ৫০০ ডলারে কিনে নিয়েছিল একটি কম্পিউটার ম্যাগাজিন যখন মাস্কের বয়স মাত্র ১২।। মাত্র ১২ বছর বয়সেই নিজের বানানো গেম বিক্রি করে তার জীবনের প্রথম আয় ৫০০ ডলার। শেখার আগ্রহ ছিল প্রচুর। দিনে ১০ ঘন্টার উপরে বই পড়তেন। পড়ার ধাত এতোই বেশি ছিল যে লাইব্রেরীর সব বই শেষ করে পুরো এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাই পড়ে ফেললেন।

মায়ের কানাডার নাগরিকত্বের সুযোগে মাস্ক প্রবল বর্ণবাদী সংঘাতের সময় কানাডায় পাড়ি জমান। ভালো শিক্ষার আসায় ১৯ বছর বয়সে আফ্রিকা ছেড়ে কানাডা চলে আসেন। অতঃপর ১৯৮৯ সালের ১৯ বছর বয়সে কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। কিন্তু দু’বছর পর তা ছেড়ে ১৯৯২ সালে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফুল ফ্রি স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। অবশেষে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পাশাপাশি পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হার্টন স্কুল থেকে অর্থনীতিতেও স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে অবশেষে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স এবং ম্যাটারিয়াল সায়েন্সের উপর উচ্চতর ডিগ্রী নিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক দু’দিন পরেই তার ভাই কিম্বাল মাস্ককে সাথে নিয়ে প্রথম আইটি কোম্পানি জিপ২ কর্পোরেশান চালু করার লক্ষ্যে স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে আসেন। আর এখান থেকে একটি যুগের শুরু। মূলত এর পর থেকেই সবকিছুর পরিচয় ছাপিয়ে এলন মাস্ক হয়ে উঠার গল্পের শুরু।

মাস্কের রক্তে মিশেছিলো আবিষ্কারের নেশা। প্রতিনিয়ত তিনি ছুটেছিলেন নতুন কিছু উদ্ভাবনের স্বপ্নলীলায়। মাস্ক সবসময় ৫ টি বিষয় নিয়ে ভাবতেন। তিনি মনে করতেন ইন্টারনেট, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, মহাকাশ ভ্রমণ, আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স এবং বায়োটেকনলজি পুরো সভ্যতাকে পালটে দিতে পারে। ইন্টারনেটের প্রতি প্রবল ঝোঁক থাকার কারণে যোগ দিয়েছিলেন সেই সময়ের ইন্টারনেট জায়ান্ট নেটস্কেপে। নেটস্কেপ থেকে নিগৃহীত হয়ে তাঁর ভাই কিম্বাল মাস্ককে নিয়েই প্রতিষ্ঠা করলেন নিজের একটি কোম্পানি জিপ২(zip2) । জিপ২ একটি ওয়েব নির্ভর সফটওয়ার কোম্পানি যার কাজ ছিল ইন্টারনেটে একটি বিজনেস ডিরেক্টরি ও ম্যাপ তৈরি করা।

সেই সময়ে ব্যাবসায়ীরা ইন্টারনেটে বিজ্ঞাপন দিয়ে পয়সা খরচ করাকে বোকামি মনে করত, কিন্তু ধীরে ধীরে ইন্টারনেটের জনপ্রিয়তার সাথে সাথে জিপ২ ও ফুলেফেঁপে উঠল। বিশ্বখ্যাত কোম্পানি কমপ্যাক জিপ২ কে ১৯৯৯ সালে ৩০৭ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়। নিখুঁত ভবিষ্যতদ্রষ্টা এলন মাস্ক মাত্র ২৭ বছরেই হন মিলিওনেয়ার।

মিলিওনেয়ার হবার পর মাস্ক থেমে থাকেননি। রক্তে যার মিশে ছিলো আবিষ্কারের নেশা, তিনি কেন থেমে থাকবেন! জিপ২ থেকে পাওয়া অর্থের তিন চতুর্থাংশই বিনিয়োগ করেন তার নতুন আইডিয়ার পেছনে। তৈরি হয় এক্স.কম (X.com)। এখান থেকেই সূচনা হয় পেপ্যাল এর। উল্লেখ্য স্টেডিয়ামের লকার রুমে রাত জেগে জেগে কাজ করে মাস্ক X.com তৈরি করেছিলেন। মূলত পেপ্যাল হলো দুইটি ফিনান্সিয়াল কোম্পানির যৌথ উদ্যোগ। X.com এর অফিস বিল্ডিং এ পিটার থিলের ইন্টারনেট ফিনান্সিয়াল কোম্পানি 'কনফিনিটি' র অফিস ছিলো। ইন্টারনেটে অর্থ লেনদেনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বুঝতে পেরে প্রতিযোগিতা ছেড়ে দুটি কোম্পানি একসাথে হয়ে গঠন করে ‘পেপ্যাল’। পরবর্তীতে ২০০২ সালে ওয়েব জায়ান্ট ebay পেপ্যালকে ১.৫ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়, যেখানে সর্বোচ্চ শেয়ার-হোল্ডার হিসেবে ট্যাক্স বাদ দিয়েই মাস্ক উপার্জন করেন ১৮০ মিলিয়ন ডলার।

এতকিছুর পরও মাস্ক আরাম আয়েশে জীবন কাটিয়ে দেননি। ছেলেবেলার দেখা স্বপ্নের উপর ভর করে তখনো তাঁর ভালোবাসার জায়গা ছিলো পরিবেশ এবং মহাকাশের উপরে। সেই স্বপ্নের পেছনে অবিরাম ছুটে চলার ফিনিক্স পাখির মতো জীবনী শক্তি ছিলো মাস্কের রক্তে। ফলে এক্স ডট কম বিক্রির করে যে মোটা অঙ্কের অর্থ তিনি পেয়েছিলেন তার অধিকাংশই ব্যয় করেছেন সৌরশক্তির পেছনে। ছোটবেলা থেকে আবিষ্কারের নেশায় ছুটে চলা এই আয়রন ম্যানের স্বপ্ন ছিলো কালো থাবা মুক্ত এক পৃথিবীর, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে পারবে, নিজেদের পরম ভালোবাসায় গড়ে তুলবে এক সুন্দর পৃথিবী। সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলার প্রথম প্রভাতে ২০০৬ সালে তার কাজিনের সাথে মিলে গঠন করে আরেকটি কোম্পানি ‘সোলার সিটি’। এটির লক্ষ্য সূর্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ঘরদোরের জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুৎ যা ফুয়েলের মাধ্যমে তৈরি করা হয়, তার পরিমাণ কমিয়ে আনা। এর মাধ্যমে তিনি চেয়েছেন তার পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ধারণাটির আরো বিস্তার ঘটাতে।

ছবিঃ techcrunch.com

তাঁর তৈরি সোলার সিটির সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি। সোলার সিটির বদৌলতে সবখানে পৌঁছে যেতে থাকে সুলভ মূল্যের বিদ্যুৎ। বর্তমানে আমেরিকার বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে যে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে, তার একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এলন মাস্কের সোলার সিটি। আর সোলারসিটি এখন আমেরিকার সর্বাধিক সোলার প্যানেল সরবরাহকারী কোম্পানি। তারা এখন আমেরিকার সর্ববৃহৎ সোলার প্রস্তুত কারখানা বসাচ্ছে বাফালোতে। এবং এই তিন কোম্পানি মিলে কর্মীর সংখ্যা ত্রিশ হাজারেও বেশি!

এলন মাস্ক ছিলেন একজন মাল্টিটাস্ককার। অর্থাৎ তিনি একসাথে অনেকগুলো প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করতেন। সোলার সিটি নিয়ে তো বলাই হয়েছে। কিন্তু সোলার সিটি তৈরি করার আগে তিনি ২০০২ সালে ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে 'স্পেস এক্স' নামে একটা নতুন কোম্পানি গঠন করেন। এটি মূলত একটি রকেট নির্মাণ কোম্পানি। মহাকাশ ভ্রমনের খরচ মানুষের নাগালের মধ্যে এবং ১০০ বছরের মধ্যে মঙ্গল গ্রহে মানুষের বসবাস নিশ্চিত করণের পেছনে এই প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। যেমনটা পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছিলো যে মাস্ক মহাকাশ বিস্তার নিয়ে শৈশবেই স্বপ্ন দেখেছিলেন। নাসা বা ইসরো যে রকেটগুলো মহাকাশে পাঠায়, সেগুলো অনেকটা ওয়ান টাইম। অর্থাৎ একবার ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়ার মতো, যাকে বলে ইউজ এন্ড থ্রো টাইপ। রকেটগুলো পৃথিবীর বলয় থেকে একটা টার্গেটে পৌঁছার পরপরই ধ্বংস হয়ে যায়। সে কথা মাথায় রেখে এলন হাত দেন তার ড্রিম প্রজেক্টে, যার নাম ‘স্পেস এক্স’। তিনি তৈরি করলেন পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেট। রকেট মহাকাশে পাঠাতে যে জ্বালানি প্রয়োজন হয়, তা প্রচুর ব্যয়সাপেক্ষ। মাথা খাটিয়ে তিনি তৈরি করলেন ভাসমান গোছের এক হেলিপ্যাড। কম জ্বালানি পুড়িয়ে পৃথিবীর অদূরে কোনো মহাসাগরের নিকটবর্তী এলাকায়, যেখানে সাধারণত রকেট ব্লাস্ট হয়, সেই স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে এই হেলিপ্যাড। এতে করে রকেট সেখানে ল্যান্ড করার সুযোগ থাকবে। এই নতুন সম্ভাবনায় নাসাও এখন এলনের সাথে আশাবাদী ও চুক্তিবদ্ধ। তাদের চিন্তা এখন অ্যাস্ট্রোনটদের কীভাবে এমন রি-ইউজেবল রকেটে করে পাঠানো যায়।

মাস্কের স্বপ্নের পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেট ( ছবি- roarmedia)

এলন মাস্কের ২০০২ থেকে ২০০৮ সময়টা খুব একটা ভালো যায়নি। টেক সমাজে একজন উদভ্রান্ত বিলিয়নিয়ার হিশেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। কারণ তিনি সময়ের তুলনায় অনেক আধুনিক চিন্তা করতেন। প্রকৃত অর্থে মাস্ক ভবিষৎ দেখতে পেতেন এবং সেভাবেই তিনি পরিকল্পনা করতেন। আর এই জন্যই মাস্ক সেরা এবং সময়ের তুলনায় অধিক সফল।

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে রকেট ফালকন ৯ এর সফল উড্ডয়ন (ছবি- উইকিপিডিয়া)

স্পেসএক্স এর তিনটি রকেট কক্ষপথে  পৌছানোর আগেই ধবংস হয়ে যায়। সময় যখন এভাবে প্রতারণা করেছে, ঠিক তখন বিনিয়োগকারীরাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো। দমে যাবার পাত্র নন মাস্ক। ধবংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর এক অদ্ভুত উজ্জীবনী শক্তি ছিলো তাঁর মধ্যে। নিজের ভাণ্ডার শূন্য হবার আগ পর্যন্ত তিনি প্রতিটি কড়ি ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন মাস্ক। অন্যদিকে টেসলার অবস্থাও বলার মতো ছিলোনা। আমেরিকা সহ সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক ধসের কারণে বাড়তি কোন বিনিয়োগ ছিলোনা। অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিগুলো যখন দেউলিয়া হবার মুখে, ঠিক তখনি গসিপ ম্যাগাজিনগুলো টেসলাকে আখ্যায়িত করছিলো ২০০৭ এর নাম্বার ওয়ান ব্যর্থ টেক কোম্পানি হিশেবে। কিন্তু আগেই বলেছিলান এলন মাস্ক হচ্ছে ফিনিক্স পাখির মতো। ২০০৮ এর শেষ মুহুর্তে তিনি ধবংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এলেন। স্পেসএক্সে তার চতুর্থ ও শেষ চেষ্টা সফল হল। রকেট ঠিকঠাক কক্ষপথে পৌঁছুল। নাসা পর্যন্ত ১.৬ বিলিয়ন ডলারের কন্ট্রাক্ট করল স্পেসএক্সের সাথে তাদের পরবর্তী ১২ টি রকেট উৎক্ষেপনের জন্যে। স্পেসএক্স ভালভাবেই দাঁড়িয়ে গেল।

আর টেসলা? এতেও বিনিয়োগ আসা শুরু করল। বাজারে আসল নতুন গাড়ি- টেসলা রোডস্টার।

টেসলা রোডস্টার ( ছবি - carbuzz.com)

এই ‘টেসলা রোডস্টার’ আরাম, সৌন্দর্য, ব্যয়বহুলতা এবং গতি- সবদিক থেকেই যেকোনো দামী গাড়ির তুলনায় কোনো দিক থেকেই কম নয়। তাছাড়া আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তেই তিনি তৈরি করলেন গাড়ি চার্জ করার পাম্প, যেখানে কিনা বিদ্যুৎ সরবরাহ হয় তার সেই সোলার সিটি থেকেই। এলনের ‘টেসলা রোডস্টার’ গাড়ির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- একবার সম্পূর্ণ চার্জ করার পর তা একটানা ৪৫০ কিলোমিটার চলতে সক্ষম ছিলো। ২০০৮ থেকে এখন পর্যন্ত ইলন মাস্কের সবকটি প্রোজেক্টের উন্নতির গ্রাফ উর্ধ্বমূখী। প্রথম তিনটি ব্যর্থ অভিযানের পর স্পেসএক্স এখন পর্যন্ত ২০ টি রকেট উতক্ষেপন করেছে যার প্রত্যেকটিই সফল। নাসা তার নিয়মিত গ্রাহক। গুগল, ফিডেলিটির মত বড় বড় কোম্পানির বিনিয়োগ আছে এখন স্পেসএক্স এ।

টেসলার মডেল-এস তুমুল জনপ্রিয় হয়, গ্রাহক রেটিং এ ৯৯/১০০ এবং ন্যাশনাল হাইওয়ে সেফটি এডমিনিস্ট্রেশন এর রেটিং এ ৫/৫ পেয়ে আগের সব রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়।

তাছাড়া মাস্কের সর্বশেষ  আবিষ্কার হলো সৌর শক্তি চালিত হাই স্পিড মোটর ‘হাইপারলুপ’। এই হাইপারলুপ মোটরের সাহায্যে লস এঞ্জেলস থেকে সানফ্রান্সিসকো পর্যন্ত ৬১৪ কিলোমিটার পথ যেতে সময় নেবে মাত্র ৩০ মিনিট। এলন মাস্কের দাবি, হাইপারলুপ হবে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির যোগাযোগ প্রযুক্তি।

হাইপারলুপ ( ছবি- উইকিপিডিয়া)

সৌরশক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থায় ঘণ্টায় ৬০০ মাইলেরও বেশি গতিতে যোগাযোগ করা যাবে, অথচ এ যোগাযোগ প্রযুক্তি হবে প্লেন বা ট্রেনের চেয়ে সাশ্রয়ী। স্টেশন থেকে দ্রুতগতির হাইপারলুপ প্রযুক্তির যানে চেপে দ্রুততম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। হাইপারলুপ প্রযুক্তি মার্কিন ব্যাংকগুলোর অর্থ লেনদেনের একটি পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এলন মাস্কের মতে, হাইপারলুপ হবে শব্দের চেয়ে দ্রুতগতির কনকর্ডবিমান, দ্রুতগতির ট্রেন ও এয়ার হকির নকশার সমন্বিত রূপ। এটি এমন একটি যোগাযোগব্যবস্থা হবে, যার মাধ্যমে একটি টিউব কয়েকটি দেশ অথবা শহরজুড়ে থাকবে। টিউবের ভেতর থাকবে ক্যাপসুল। টিউব ব্যবস্থার মধ্যে কোনো বায়ু থাকবে না। ফলে থাকবে না কোনো প্রকার ঘর্ষণশক্তি। এই দ্রুতগতির ক্যাপসুলে চড়ে ঘণ্টায় ৬০০ মাইল বেগে ভ্রমণ করা যাবে।হাইপারলুপ ব্যবস্থায় ঘণ্টায় দুই লাখ মানুষের ভ্রমণের সুযোগ থাকবে। আর নিউইয়র্ক থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে যেতে সময় লাগবে মাত্র ৪৫ মিনিট এবং নিউইয়র্ক থেকে বেইজিং যেতে লাগবে দুই ঘণ্টা। মাস্ক প্রবর্তিত এই হাইপারলুপ প্রযুক্তি পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয় এ বছর। হাইপারলুপ ট্র্যাক নির্মাণে খরচ হবে ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার।

এলন মাস্ক যেন যুগান্তকারী আবিষ্কারের এক অনবদ্য প্রতিশব্দ। তিনি যেন নিজেকে ক্রমান্বয়ে ছাড়িয়ে যাওয়া এক নিরলস উদ্ভাবক, বিনিয়গকারী কিংবা বিলিয়নারের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই সব কিছুর পেছনে ছিলো মাস্কের কাজের প্রতি ভালবাসা এবং স্বপ্নের প্রতি একাগ্রতা। জীবনের উন্নয়ের সিঁড়িতে অনেক চড়াই উৎরাই পার হতে হয়েছে। সাময়িক অনেক বাঁধা এসে স্থবির করে দিতে চেয়েছিলো পথ চলা। কিন্তু এলন মাস্ক ছিলেন অদম্য। জীবনের অসাধ্যের দিনলিপিতে যত বিদঘুটে সমীকরণ ছিল, সব সমীকরণ তিনি পালটে দিয়েছেন। সময়ের চেয়ে আধুনিক চিন্তা করে তিনি নিজেই হয়েছেন নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাতা। কথিত আছে- কর্ম প্রণোদিত মাস্ক এ স্তরে পৌঁছেও সপ্তাহে ৮০-১০০ ঘন্টা কাজে সময় দেন। মাঝে মাঝে কাজ করতে করতেই বাড়ির রাস্তা ভুলে ঘুমিয়ে পড়েন তার ‘টেসলা’ ম্যানুফ্যাকচারিং অফিসেই। সোমবার যান লস অ্যাঞ্জেলস এ SpaceX এর তদারকিতে। মঙ্গল আর বুধবার তোলা থাকে Tesla র জন্যে। বৃহস্পতিবার আবার SpaceX। শুক্রবারটা অর্ধেক কর্মদিবস করে ভাগাভাগি করে নেয় দুটো কোম্পানি। আর মাস্ক বিশ্বাস করেন তিনি Biological Barrier ভাঙতে পেরেছেন। দিনে ১৬ ঘণ্টা কাজ করা তার পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়। একসাথে অনেকগুলো কাজ তিনি সমন্বয় করতে পারেন। নিজেকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ছুড়ে দিয়ে নিজের সর্বোচ্চটাই বের করে আনেন তিনি।

শেষ করছি একটি ছোট্ট গল্প দিয়ে,

প্রতিবছর নেভাদার মরুভূমিতে ‘বার্নিং ম্যান’ নামে একটা জমায়েত হয়। ২০০৪ সালের জমায়েতে ৩০ ফুট উচু একটা গাছের গুড়ি স্থাপন করে লোকজন, যার উপর নাচানাচি করার মতো একটা ছোট জায়গাও ছিল। কয়েক ডজন লোক এই গুড়িটা বেয়ে উঠতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। তখন নতুন একজন এই আরোহন অভিযানে আগ্রহ প্রকাশ করে। সবাই ভ্রু কুঁচকে দেখল, লোকটির ৩০ ফুট বেয়ে উপরে উঠতে পারার কোন সম্ভাবনাই নেই। তারপরও সে উঠতে থাকে। পুরো সময়টা সে আনাড়ির মতো গুড়িটি জড়িয়ে ধরে থাকে এবং ইঞ্চি ইঞ্চি করে উপরে উঠতে থাকে। তার অদম্য চেষ্টা তাকে ৩০ ফুট উচ্চতায় নিয়ে যায়।

লোকটা আর কেউ নন। এলন মাস্ক!

রেফারেন্সঃ
1) Wikipidea 
2) https://www.theodysseyonline.com/elonmusk
3) https://www.biography.com/people/elon-musk-20837159
4) https://astrumpeople.com/elon-musk-biography/

লিখাটি নিয়ে আপনার অভিমত কি?