সায়েন্স ফিকশন: নি:সঙ্গ অভিযাত্রী (৩য় পর্ব)

949

আগের পর্বগুলো:

সায়েন্স ফিকশন: নি:সঙ্গ অভিযাত্রী (১ম পর্ব)

সায়েন্স ফিকশন: নি:সঙ্গ অভিযাত্রী (২য় পর্ব)

 

.................................................

সচেতন অবস্থায় মানুষ তার নিউরণে যে পরিমাণ স্মৃতি রাখে তাই সেন্ট্রাল কো-ইনফরমেশান মডিউলে রাখা হয়। এই জিনিসটি করা হয় মানুষের নার্ভাস সিস্টেমের কার্যনীতির উপর।সচেতন অবস্হায় মানুষ তার নিউরণে যে পরিমান স্মৃতি রাখে তা ই সেন্ট্রাল কো-ইনফরমেশান মডিউলে রাখা হয়।কিন্তু অচেতন অথবা ঘুমন্ত অবস্থায় নার্ভাস সিস্টেম অনেকটা শিথিল অবস্হায় থাকে।

 

তাই এই সময়ের স্মৃতির রিকভার এখনও সম্ভব হয়নি। অনেকেই এটা নিয়ে গবেষণা করছেন। কিন্তু রামিনের নিজের উপর খুব রাগ লাগছে ভালবাসার একটা ঘটনাও কেন সে মনে রাখতে পারেনা। নিজেকে একটা অপদার্থ মনে হতে থাকে।

হঠাৎ ই আবার রাকার গলা শুনতে পায় রামিন। রাকা বলতে থাকে, “রামিন আমি গবেষণার জন্যে প্রধান বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে সুযোগ পেয়েছি”। রামিন বুঝতে পারে রাকার আসল উচ্ছ্বাস প্রধান বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে গবেষণার সুযোগ পাওয়ার জন্যে নয়। রাকার আসল উচ্ছ্বাস এখন থেকে রাকা রামিন যেখানে কাজ করে সেখানে থাকতে পারবে,অনেক কাছাকাছি থাকতে পারবে রামিনের এই জন্যেই। সৌজন্যতার জন্য তবুও নিস্পৃহ গলায় জিজ্ঞেস করে, “কিসের গবেষনা”? রামিনের ভাবলেশহীন জবাবেও রাকার উচ্ছ্বাসে এতটুকু ভাটা পড়েনা। সে বলতে থাকে, “আমরা জেনেটিক মিউটেশানের মাধ্যমে একটা ট্রান্সজেনিক অ্যানিমেল বানিয়েছিলাম যে যেটা প্রচুর পরিমাণে হিট শুষে নিতে পারে। তোমাদের বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের নতুন প্রধান ইমি প্রিনিস আমাদের এই প্রোজেক্টটাকে অনেক পছন্দ এবং গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন পৃথিবীর গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ন্ত্রণে।”

 

উফ্ আবার সেই সাইবর্গ। রামিন চুপ করে থাকে এবং পরে কথা বলবে বলে সেন্সর বন্ধ করে দেয়। রাকার অনেক কষ্ট হতে থাকে। সে ভেবেছিল রামিন একটু হলেও খুশি হবে। সামনে যতই নিস্পৃহ ভাব দেখাক, মনে মনে ঠিকই পছন্দ করে সে রাকাকে। কিন্তু রাকার হঠাৎ মনে হয় রামিন তাকে একটুও পছন্দ করেনা তাই এভাবে এড়িয়ে চলে।  ভাবতেই বুকের ভিতরটা টুকরো টুকরো হয়ে যেতে থাকে। কষ্টে রামিন কে গালি দিতে ইচ্ছে করে। রাকা অনেক খুশি হয়েছিল এই সুযোগটা পেয়ে রামিনের আশেপাশে থাকা যাবে এটা ভেবে।

 

হঠাৎ বুক ফেটে কান্না আসতে থাকে।ইচ্ছে করে,রামিন কে গলিয়ে সুপার গ্লু বানিয়ে একটা টিউবে ভরে রাখতে। তাহলে এরপর থেকে যখন ই ওর কারনে বুক ভেঙ্গে যাবে তখন ওকে দিয়ে বানানো সুপার গ্লু দিয়ে জোড়া লাগানো যাবে।এসব ভাবতে ভাবতেই রামিনের উপর থেকে সব রাগ চলে যায়।

 

আপন মনে হাসতে হাসতেই বলতে থাকে, “আমাকে তোমার ভালবাসতে হবেনা রামিন। আমি তোমাকে এত বেশি ভালবাসি যে আমার একার ভালবাসাতেই আমাদের দুজনের জীবন কেটে যাবে।”

ইমি প্রিনিস মোটামুটি সবকিছুই ভালভাবে চালাচ্ছে। তবুও তাকে কেন যেন একদমই সহ্য করতে পারছেনা রামিন। তবুও সে সব ভুলে তার কাজে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে। মানুষের ঘুমন্ত অথবা অচেতন অবস্থার স্বপ্ন কিংবা দুর্বল স্মৃতিগুলোকে নিউরণ থেকে উদ্ধার করে কিভাবে সেন্ট্রাল কো-ইনফরমেশান মডিউলে ট্রান্সফার করা যায় এটা নিয়ে সে গবেষণা করছে।

 

কিন্তু এই সময়টাতে নার্ভাস সিস্টেম এতো বেশি শিথিল হয়ে থাকে যে, নিউরণ থাকে কোনও সিগন্যাল পাওয়া যায়না তেমন। মাঝে মাঝে একটু পেলেও সেটা ট্রান্সমিটারে পাস করার আগেই নষ্ট হয়ে যায়। রামিন চেষ্টা করছে সিগন্যালগুলোকে কোনোভাবে মডুলেটেড করে ট্রান্সমিট করা যায় কিনা। কিন্তু পিকোটেকনোলজির কিছু শক্তিশালী মডুলেটর ব্যবহার করেও কোনও ফল পাচ্ছেনা রামিন।

আজ ইমি প্রিনিস রামিন কে একটা মিটিং এ ডেকেছিল তার মুখ থেকে তার গবেষণার খোঁজখবর নেওয়ার জন্যে। আজ ভালভাবে খেয়াল করেছে রামিন সাইবর্গটাকে। চোখের দৃষ্টি খুব বেশি তীক্ষ্ণ,শান্ত সাবলীল চেহারা। রামিন মিটিং শেষে চলে আসে। ইমি প্রিনিস এর কোথায় যেন বড় রকমের একটা অস্বাভাবিকতা মনে হয় রামিনের। কিন্তু সেটা কি তা বুঝতে পারেনা। আসে। মনটা খুব উশখুস করতে থাকে।

**********************************************************************************************************

সারাদিন এর ক্লান্তি শেষে রাতে বাসায় ফিরে খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে রামিন। ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখে রাকা মারা যাচ্ছে। স্বপ্নের মাঝেই রাকার জন্য কষ্ট হতে থাকে রামিনের। স্বপ্নটা দেখেই ঘুম ভেঙ্গে যায় রামিনের। চোখ খুলে দেখে সে প্রধান বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের ল্যাবরেটরিতে। অবাক হয় রামিন। এটাও স্বপ্ন কিনা বুঝতে পারেনা। চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা লাগে রামিনের। ক্যাপ্সুলের মত একটা জায়গায় সে শুয়ে আছে এবং তার পুরো শরীর শক্ত বাঁধা। অনেক চেষ্টা করেও কোনোভাবে শরীরটাকে একটু নাড়াতে পারলনা রামিন।

 

অনেক কষ্টে সে বুঝতে পারল তাকে একটু একটু করে ইথানল-৬ দেওয়া হচ্ছে। এজন্যেই শরীর এতো ভারী হয়ে আছে আর সবকিছু ঝাপসা লাগছে। কিন্তু কে দিচ্ছে, কেন দিচ্ছে তার কিছুই আর চিন্তা করতে পারলনা রামিন। একটু পরেই পরিচিত একটা মুখের অবয়ব বুঝতে পারে রামিন। কিন্তু ইথানল-৬ এর জন্যে মাথাটাও একদমই আর কাজ করছেনা। কিন্তু আস্তে আস্তে সব একটু পরিস্কার লাগে রামিনের চোখে। হয়ত ইথানল-৬ দেওয়া বন্ধ হয়েছে। যখন পরিচিত মুখটা স্পষ্ট বুঝতে পারে রামিন আকাশ থেকে পড়ার মত অবস্থা হয় তার। সে আর কেউ নয়, প্রধান বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান ইমি প্রিনিস। হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে রামিন।

ইমি প্রিনিস তার শান্ত নিরুত্তাপ কন্ঠে বলতে থাকে, “রামিন,তুমি নিশ্চয় অবাক হয়েছ এখানে আমাকে এবং তোমাকে এভাবে দেখে। তোমাকে এই পরিস্থিতির সম্মুখীন করার জন্যে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত এবং এখন থেকে আমি তোমাকে নিয়ে যা যা করব তার জন্যেও আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। রামিন বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে থাকে। অনেক কষ্টে গলার স্বরকে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রেখে কোনমতে জিজ্ঞেস করে, “কি করা হবে আমাকে নিয়ে?”

বলব, তোমাকে ব্যবহার করে যেহেতু করব তোমার সব জানার অধিকার অবশ্যই আছে। তুমি যে গবেষণাটা করছ সেই গবেষণাটা আমি করব। কিন্তু এটার জন্য আমার একটা উৎকৃষ্ট মস্তিষ্ক প্রয়োজন। আর সেই উৎকৃষ্ট মস্তিষ্ক হিসেবে আমি তোমার মস্তিষ্ককে বেছে নিয়েছি। এটা কেউ জানবেনা তুমি যে এখানে। এজন্যই অনেক কঠিন নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে

তোমাকে এখানে আনা হয়েছে। তোমাকে আর সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা বাঁচিয়ে রাখা হবে। তুমি মৃত্যুর জন্য তোমার কোনও পছন্দের ব্যবস্থা থাকলে জানিয়ে দিতে পার। এর চেয়ে বেশিকিছু আপাতত তোমার জন্য করা সম্ভব নয়। রামিনের ইচ্ছা করে জানোয়ারটাকে কুচি কুচি করে ফেলতে।

( চলবে.... )

 

লিখাটি নিয়ে আপনার অভিমত কি?