স্ট্যান্ডার্ড মডেল

স্ট্যান্ডার্ড মডেল

আমাদের চারপাশে যত বস্তু আছে সেগুলো সবই বিভিন্ন প্রকার অণু-পরমাণু দ্বারা গঠিত। এক বা একাধিক পরমাণু একত্রিত হয়ে অণু গঠন করে, আর পরমাণু গঠিত হয় ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন দিয়ে। পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস, সেখানে সবগুলো প্রোটন ও নিউট্রন কেন্দ্রীভূত অবস্থায় থাকে, আর ইলেকট্রনগুলো এই নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। কিন্তু এই ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন আসলে কি? আর এগুলো কোন বল দ্বারা এবং কিভাবে একত্রিত অবস্থায় থাকে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বের করতে পদার্থবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন তত্ত্ব দিয়েছেন, যেগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য হল স্ট্যান্ডার্ড মডেল তত্ত্ব।

 স্ট্যান্ডার্ড মডেল-১

 

স্ট্যান্ডার্ড মডেল তত্ত্বটি মূলত সত্তুরের দশকে পূর্ণতা পায়। এ মডেল অনুসারে কিছু মৌলিক কণিকা পদার্থ গঠন করে, যাদের ফার্মিয়ন (ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মির

নামানুসারে) বলে এবং কিছু কণিকা বলের বাহক হিসেবে ক্রিয়া করে, যাদের বোসন (ভারতীয়

পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বোসের নামানুসারে) বলে।

 স্ট্যান্ডার্ড মডেল-২

মৌলিক কণিকাগুলোর কিছু বিশেষ ধর্ম থাকে যেগুলো দ্বারা এর বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়, যেমনঃ ভর, বৈদ্যুতিক আধান, স্পিন ইত্যাদি। বোসনের স্পিন থাকে শূণ্য অথবা পূর্ণ সংখ্যা (০,১,২.....) এবং ফার্মিয়নের স্পিন থাকে পূর্ণ সংখ্যার অর্ধেক (১/২,৩/২,৫/২.....)। ফার্মিয়ন ফার্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান এবং পাউলি-র বর্জন নীতি মেনে চলে। এ নীতি অনুসারে একাধিক ফার্মিয়ন একই সময়ে একই স্থানে অবস্থান করতে পারে না, ফলে বাস্তবেও আমরা দেখি এক বস্তু অন্য বস্তুকে ভেদ করে যেতে পারে না। অপরদিকে বোসন বর্জন নীতি অনুসরন না করায় সহযেই একে অপরকে ভেদ করতে পারে (যেমন – আলো এবং অন্যান্য তড়িতচুম্বকীয় তরঙ্গ)। বোসন বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান অনুসরন করে।

 

ফার্মিয়নঃ ফার্মিয়ন মোট ১২ রকমের হয়, এদের প্রত্যেককে এক একটি ফ্লেভার [Flavor] বলে (এর সাথে কিন্তু স্বাদ গ্রহনের কোন প্রকার সম্পর্ক নেই)। ১২টি ফার্মিয়নের আবার অনুরূপ ১২টি প্রতিকণিকা [Antiparticle] আছে (যেমন ইলেক্ট্রনের প্রতিকণিকা পজিট্রন)। ফার্মিয়নের মধ্যে দুইটা ভাগ আছে, কোয়ার্ক এবং লেপ্টন।

 

স্ট্যান্ডার্ড মডেল-৩

কোয়ার্ক ছয়টি ফ্লেভারের হয় – আপ u, ডাউন d, চার্ম c, স্ট্রেঞ্জ s, টপ t, বটম b। এরা একা থাকতে পারে না, সবসময় দুইটি বা তিনটির গ্রুপ গঠন করে। তিনটি কোয়ার্কের (অথবা তিনটি অ্যান্টিকোয়ার্কের) গ্রুপকে ব্যারিয়ন বলে। যেমনঃ প্রোটন p (আপ-আপ-ডাউন), নিউট্রন n (আপ-ডাউন-ডাউন), ওমেগা Ω (স্ট্রেঞ্জ-স্ট্রেঞ্জ-স্ট্রেঞ্জ) ইত্যাদি। একজোড়া কোয়ার্ক-অ্যান্টিকোয়ার্কের গ্রুপকে মেসন বলে। যেমনঃ ধনাত্মক পাইওন π+ (আপ-অ্যান্টিডাউন), ঋনাত্মক পাইওন π- (অ্যান্টিআপ-ডাউন), চার্মড ইটা মেসন ηc (চার্ম-অ্যান্টিচার্ম) ইত্যাদি। ব্যারিয়ন ও মেসনকে একত্রে হ্যাড্রন বলে। ইউরোপের প্রভাবশালী বিজ্ঞান সংস্থা সার্নের (ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ) লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে (LHC) এই হ্যাড্রনেরই অতিউচ্চগতির সংঘর্ষ ঘটানো হয়।

ফার্মিয়নের আরেকটি ভাগ হল লেপ্টন। এরা একা থাকতে পারে। সবচেয়ে পরিচিত লেপ্টন হল ইলেকট্রন e। এছাড়াও মিউওন μ, টাউওন τ এবং এ তিনটির অনুরূপ নিউট্রিনো - ইলেকট্রন নিউট্রিনো νe, মিউওন নিউট্রিনো νμ, টাউওন নিউট্রিনো ντ লেপ্টনের অন্তর্ভুক্ত।

 

১২টি ফার্মিয়নকে আবার ৩টি জেনারেশনে ভাগ করা হয় – I, II এবং III.

 

স্ট্যান্ডার্ড মডেল-৪

জেনারেশন  I-এর চেয়ে জেনারেশন  II-এর কণিকাগুলোর ভর বেশি, আবার জেনারেশন  II-এর চেয়ে জেনারেশন  III-এর কণিকাগুলোর ভর আরও বেশি। প্রত্যেক জেনারেশনের ভেতরে আবার কোয়ার্কের ভর লেপ্টনের চেয়ে বেশি। লেপ্টনের মধ্যে নিউট্রিনোগুলোর ভর সবচেয়ে কম, প্রায় নেই বললেই চলে। প্রত্যেক জেনারেশনের প্রথম কোয়ার্কের বৈদ্যুতিক আধান +২/৩, দ্বিতীয় কোয়ার্কের আধান -১/৩, ভারী লেপ্টনের আধান -১ আর নিউট্রিনোর কোন আধান নেই। প্রথম জেনারেশনের আধানযুক্ত কণিকাগুলো দিয়েই মূলত আমাদের চারপাশের জগত গঠিত। অন্যান্য জেনারেশনের আধানযুক্ত ভারী কণিকাগুলো শুধু অতি উচ্চশক্তিসম্পন্ন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হয় এবং অতিদ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে হালকা স্থিত কণিকায় রুপান্তরিত হয়। আর আধানবিহীন নিউট্রিনোগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না এবং অন্যান্য কণিকার সাথে তেমন কোন প্রতিক্রিয়াই দেখায় না।

 

এই ধর্মের জন্য সাম্প্রতিক কালের আলোর-চেয়ে-দ্রুতগতির-কণার-অস্তিত্ব-নিয়ে-প্রশ্ন-তোলা আলোচিত অপেরা এক্সপেরিমেন্টে মিউওন নিউট্রিনো ব্যবহার করা হয়েছিল।

 

বোসনঃ বোসন মোট ২ প্রকার – গেজ বোসন ও হিগ্‌স বোসন। গেজ বোসন বলের বাহক হিসেবে ক্রিয়া করে। এর স্পিন ১। মৌলিক বল চার প্রকার -  তড়িতচুম্বকীয় বল, সবল নিউক্লীয় বল, দুর্বল নিউক্লীয় বল এবং মাধ্যাকর্ষন বল। গেজ বোসন প্রথম তিনটির সাথে সম্পর্কিত।

 

তড়িৎচুম্বকীয় বল ক্রিয়া করে বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত কণিকাগুলোর মধ্যে। এর পাল্লা অসীম, শক্তি সবল নিউক্লীয় বলের চেয়ে কম কিন্তু দুর্বল নিউক্লীয় বলের চেয়ে বেশি। এর বাহক হল ফোটন γ, যার নিজের কোন ভর বা আধান নেই। এ সংক্রান্ত তত্ত্বকে কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রোডিনামিক্স (QED) বলে।

 

স্ট্যান্ডার্ড মডেল-৫

সবল নিউক্লীয় বল ক্রিয়া করে কালারযুক্ত কণিকা অর্থাৎ কোয়ার্কসমূহ ও গ্লুওন g-এর মধ্যে। কালার হল ভর, বৈদ্যুতিক আধান বা স্পিন-এর মতই মৌলিক কণিকার আরেকটি বিশেষ ধর্ম। প্রতিটি কোয়ার্ক ৩ কালারের হয় – লাল, সবুজ ও নীল। নামের মিল থাকলেও এর সাথে দৃশ্যমান রঙের কোন সম্পর্ক নেই, এ নামগুলো দেয়া হয়েছে একটি বিশেষ সম্পর্কের জন্য। কোয়ার্ক কখনও একা থাকতে পারে না, সবসময় দুইটি (মেসন) বা তিনটির (ব্যারিয়ন) গ্রুপ গঠন করে। লাল, সবুজ ও নীল আলো মিলে যেমন রঙবিহীন বা সাদা আলো গঠন করে, তেমনি কোয়ার্কও এমনভাবে গ্রুপ গঠন করে যেন সবগুলো মিলে সাদা বা রঙবিহীন অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাই ব্যারিয়নে সবসময় থাকে লাল, সবুজ ও নীল কোয়ার্ক এবং মেসনে থাকে যে কোন একটি কালার ও তার অ্যান্টিকালার (অ্যান্টিকোয়ার্ক থেকে)।

সবল নিউক্লীয় বলের পাল্লা খুবই ক্ষুদ্র, মাত্র ১০-১৫ মিটারের মত। এ বলের কারণেই কোয়ার্ক প্রোটন বা নিউট্রনের মত হ্যাড্রন গঠন করে। এ ক্ষেত্রে বলের বাহক হল গ্লুওন, এটি আঁঠার (glue) মত কাজ করে বলে এর নাম দেয়া হয়েছে gluon। ফোটনের মত গ্লুওনেরও নিজের কোন ভর বা আধান নেই। গ্লুওন ৮ প্রকার, তবে সেগুলো কোয়ার্কের চেয়ে অনেক জটিল, ৮টি কালার-অ্যান্টিকালারের জোড় হিসেবে থাকে। নিজস্ব পাল্লার ভেতর সবল নিউক্লীয় বলের শক্তি অন্যান্য মৌলিক বলের চেয়ে অনেক বেশি, প্রোটন ও নিউট্রন গঠনের পরও অতিরিক্ত থাকা বল তড়িতচুম্বকীয় বলকে পরাহত করে পরমাণুর নিউক্লিয়াস গঠন করে। এ অতিরিক্ত সবল নিউক্লীয় বলের বাহক হল মেসন। সবল নিউক্লীয় বলের আরেকটি স্পেশাল বৈশিষ্ট্য হল এর পাল্লার মধ্যে দুইটি কণিকার দুরত্ব যত বাড়ে, এদের মধ্যকার বল ততই বৃদ্ধি পায়, যা তড়িতচুম্বকীয় বল ও মাধ্যাকর্ষন বলের ঠিক বিপরীত। তাই কোয়ার্ককে কখনও আলাদা করা যায় না। কারন দুইটি কোয়ার্ককে আলাদা করতে চাইলে প্রচুর পরিমাণ শক্তি সরবরাহ করতে হবে, আর এদের মধ্যে দুরত্ব যত বাড়বে শক্তির পরিমাণও তত বাড়াতে হবে, ফলে একসময় শক্তির পরিমাণ এতই বাড়বে যে কোয়ার্কদুটি আলাদা হয়ে ঐ শক্তি থেকে অ্যান্টিকোয়ার্ক উৎপন্ন করে আবার নতুন করে কোয়ার্ক-অ্যান্টিকোয়ার্ক জোড় গঠন করবে। সবল নিউক্লীয় বল সংক্রান্ত তত্ত্বকে কোয়ান্টাম ক্রোমোডিনামিক্স (QCD) বলে।

 

স্ট্যান্ডার্ড মডেল-৬

দুর্বল নিউক্লীয় বল ক্রিয়া করে ফ্লেভারযুক্ত কণিকা অর্থাৎ ফার্মিয়নের মধ্যে। এটি খুব দুর্বল বল এবং এর পাল্লা সবল নিউক্লীয় বলের চেয়েও ক্ষুদ্র, মাত্র ১০-১৮ মিটারের মত। এর দ্বারা পরমাণুর তেজষ্ক্রিয় ক্ষয় ব্যাখ্যা করা যায়। এর বাহক হল W+, W- ও Z0 বোসন (কোন কোন ক্ষেত্রে হিগ্‌স বোসনকেও ধরা হয়)। এদের নিজস্ব ভর আছে, এর মধ্যে Z0-এর ভর সবচেয়ে বেশি। এদের নিজস্ব আধানও আছে, W+-এর আধান +১, W--এর আধান -১ এবং Z0 আধান নিরপেক্ষ। দুর্বল নিউক্লীয় বল সংক্রান্ত তত্ত্বকে কোয়ান্টাম ফ্লেভারডিনামিক্স (QFD) বলে। তবে তড়িতচুম্বকীয় বল ও সবল নিউক্লীয় বলকে একত্রে ইলেক্ট্রোউইক থিওরীতে (EWT) আলোচনা করা হয়।

 

মাধ্যাকর্ষন বল ক্রিয়া করে সকল কণিকার মধ্যে। এটি খুবই দুর্বল বল, কিন্তু এর পাল্লা অসীম এবং সবসময়ই শুধুমাত্র আকর্ষণ করে। স্ট্যান্ডার্ড মডেল তত্ত্ব এটি ব্যাখ্যা করতে পারে না এবং কখনও পারবেও না। ধারণা করা হয় এ বলেরও একটি বাহক আছে, এর প্রস্তাবিত নাম গ্র্যাভিটন। এটি একটি ভরবিহীন কণিকা যার স্পিন ২। মাধ্যাকর্ষন বল সংক্রান্ত তত্ত্বকে কোয়ান্টাম জিওমেট্রোডিনামিক্স (QGD) বা কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটেশন বলে।

স্ট্যান্ডার্ড মডেল-৭

হিগ্‌স বোসন স্ট্যান্ডার্ড মডেলের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কণিকা, কারণ এটি ফোটন ও গ্লুওন বাদে অন্যান্য সকল কণিকার ভর থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে। ধারণা করা হয়, ভরের উৎপত্তি ঘটে মৌলিক কণিকার হিগ্‌স ক্ষেত্রে পরিভ্রমনের জন্য। এই হিগ্‌স ক্ষেত্রের ক্ষুদ্রতম অংশই হল হিগ্‌স বোসন। এর স্পিন হল ০। স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে, হিগ্‌স বোসন না থাকলে সকল কণিকাই ভরবিহীন হত। এটিই স্ট্যান্ডার্ড মডেলের একমাত্র কণিকা যেটি এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। সার্নের বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী এ বছরের মধ্যেই এর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

 

সত্তুরের দশকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর স্ট্যান্ডার্ড মডেলের ভবিষ্যৎদ্বানী অনুযায়ী নতুন কিছু মৌলিক কণিকা আবিষ্কৃত হওয়ায় তত্ত্বটি আরও পাকাপোক্ত হয়। ১৯৭৭-এ বটম কোয়ার্ক, ১৯৯৫-এ টপ কোয়ার্ক ও ২০০০-এ টাউ নিউট্রিনো আবিষ্কৃত হয়। এদের ধর্ম ও বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যৎদ্বানীর সাথে প্রায় পুরোপুরি মিলে যায়। তবে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। যেমন– এ তত্ত্বে ডার্ক ম্যাটারের কোন স্থান রাখা হয়নি, এ তত্ত্ব মাধ্যাকর্ষন বল ব্যাখ্যা করতে পারে না। এ সত্ত্বেও স্ট্যান্ডার্ড মডেলের গুরুত্ব অপরিসীম, তাই একে বলা হয় প্রায় সবকিছুর তত্ত্ব (Theory of almost everything)। পদার্থবিজ্ঞানীদের মতে, সবগুলো মৌলিক বল একত্রিত করে একটি সবকিছুর তত্ত্বও (Theory of everything) বের করা সম্ভব।

 

তথ্যসূত্রঃ

১. http://physics.info/standard/

২. http://h2g2.com/dna/h2g2/A666173

 

--------------------------------------------------------------------------

লেখকঃ রাশেদ মাহমুদ, শাবিপ্রবি।

[ লেখাটি বিজ্ঞান বাংলা প্রকাশিত গ্যালাক্টিকা ম্যাগাজিনের জানুয়ারি সংখ্যা,২০১৩ তে প্রকাশিত ]

Facebook Comments

Leave a Reply